চট্টগ্রাম । শনিবার, ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ ,২২শে কার্তিক, ১৪৩৩

ট্রেন্ডিং :

ভাষা আন্দোলনে যার গায়েবানা জানাজা হয় সেই ভাষাসৈনিক ফয়েজ ফটিকছড়ি’রই পুত্র!

হালদা রিপোর্ট : ৫২ এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পুস্তিকার ৬৯৫ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত ৪১নং ভাষাসৈনিক মুহম্মদ ফয়েজ (পরবর্তীতে অ্যাডভোকেট ও রাষ্ট্রদূত) ফটিকছড়ি’রই এক কৃতি সন্তান। যার জন্ম চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলাধীন বখ্তপুর ইউপির ঐতিহ্যবাহী বখ্শ আলী মুন্সী বাড়ীতে ১৯২৯ সনের ৩০ ডিসেম্বরে। 

যাকে ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশী এ্যাকশনের মূখে নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রাম চলে আসায় তাঁকে খুঁজে না পেয়ে পুলিশ হত্যা করে লাশ গায়েব করার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তাঁর সহযোদ্ধারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা পড়েন বলে তথ্য রয়েছে।

ভাষা-আন্দোলনে মুহম্মদ ফয়েজের অবদান:

(১) ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে যে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়; উক্ত পরিষদে ইকবাল হলের (বর্তমান জহুরুল হক হল) প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি।

(২) ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা শহরে যেসব বিক্ষোভ হয়েছে; সেগুলোর প্রায় সব কয়টিতেই মুহম্মদ ফয়েজ নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন।

(৩) তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলনকে গতিশীল রক্ষার স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়েছিলো।

(৪) ২১ ফেব্রুয়ারির দিন তিনি একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে সেক্রেটারিয়েটের দিকে যাওয়ার চেষ্টাকালে হাইকোর্টের গোলচত্বরে সশস্ত্র পুলিশের আক্রমণে পড়েন। পরে সেখান থেকে গতি পরিবর্তন করে মিছিলটি নিয়ে ভিক্টোরিয়া পার্কে গিয়ে সেখানে সমাবেশ করেন।

(৫) ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রাম চলে আসেন এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি ফটিকছড়ি স্কুল মাঠে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে বিরাট সমাবেশের আয়োজন করেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে পুলিশী এ্যাকশনের মূখে নারায়ণগঞ্জ হয়ে চট্টগ্রাম চলে এলে তাঁকে পুলিশ হত্যা করে লাশ গায়েব করার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে তাঁর সহযোদ্ধারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা পড়েন বলে তথ্য রয়েছে।

(৬) রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে দুইজন ছাত্রকে বহিস্কার করা হয়েছিলো এবং পরে তাঁদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নিতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিলো- তাঁদের মধ্যে মুহম্মদ ফয়েজ একজন (অপরজন হলেন শামসুল হক চৌধুরী)।

তিনি কর্মজীবনে একজন প্রথিতযশা আইনজীবী ছিলেন। সে সুবাদে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি থাকা কালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উপস্থিতিতে আইনজীবী সমাবেশে দাবী জানিয়ে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির জন্য জায়গা বরাদ্দ করান। যেখানে আজকে মূল আইনজীবী ভবন, এনেক্স-১ ও এনেক্স-২ এবং শাপলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে; অথচ তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ একটি নামও কোথাও সংযোগ করা হয়নি! কি অকৃতজ্ঞ জাতি!

তিনি আরো ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিযুক্ত সুইডেনসহ একসাথে বেশ ক’টি দেশের রাষ্ট্রদূতও। 

এলাকার শিক্ষা প্রসারে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠায় অনবদ্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।

তাঁর স্ত্রী মহিয়সি নারী হাসনা হেনা ছিলেন চট্টগ্রামের বনেদী পরিবারের কৃতিপূরুষ ও যুক্তফ্রন্টের বাণিজ্য মন্ত্রী মাহমুদুন্নবী চৌধুরীর বড় কন্যা এবং সদ্য নির্বাচিত অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বড় বোন। তাঁরা উভয়ের ঔরষজাত পুত্র হলেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারক, বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং মিডিয়া সেল মেম্বার বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়জী। 

এ বর্ষিয়ান আইনজ্ঞ, রাজনীতিবিদ ও কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব মুহম্মদ ফয়েজ ২০০৮ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে ইন্তিকাল করেন এবং তাঁকে গ্ৰামের বাড়ি ফটিকছড়ি’র বখ্তপুরস্থ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top